হযরত শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা: সোনারগাঁর সুপ্রাচীন জ্ঞানালোক ও নিসর্গ-চেতনার মুকুটমণি…

​সোনারগাঁর মাটি ও হাওয়া যেন ইতিহাসের পাতায় মোড়ানো। এই জনপদের শেকড় খুঁজতে গেলে সবার আগে যাঁর নাম উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন সাধক মনীষী হযরত শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (র.)। তাঁর পরশেই সোনারগাঁ তথা পূর্ব বাংলার মাটি ইসলামী জ্ঞানচর্চা এবং আধ্যাত্মিক সুবাসে ধন্য হয়ে উঠেছিল।
​অথচ শায়খ তাওয়ামা কখনো রাজক্ষমতা বা বিলাসী জীবনের মোহে আচ্ছন্ন ছিলেন না। ক্ষমতার লোভ তাঁকে কোনো দিন টলাতে পারেনি; বরং নির্জনতা ও সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি সোনারগাঁয়ে এমন এক প্রজ্ঞার সমাজ বিনির্মাণ করেছিলেন, যার দৌলতে এই জনপদ বাংলার বুকে ইসলামী জ্ঞানবৃক্ষের এক অমর উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়।
​জন্ম, বংশ ও খোরাসানের দিনগুলো
​ঐতিহাসিক দলিলপত্র ঘেঁটে জানা যায়, হযরত আবু তাওয়ামা বুখারার এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মহান ইমাম বুখারী (র.)-এর পবিত্র জন্মভূমির এই বীর সন্তান শৈশবেই জ্ঞানান্বেষণে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পারস্যের খোরাসানে ছুটে গিয়েছিলেন।
​নতুন পরিবেশে উচ্চশিক্ষার আলোয় নিজেকে ঋদ্ধ করে তিনি যখন শিক্ষকতার মহান ব্রতে নিজেকে সঁপে দিলেন, ঠিক তখনই তাঁর সামনে এসেছিল বিলাসবহুল রাজদরবারের সুযোগ। কিন্তু আত্মত্যাগী এই মনীষী জাগতিক সমস্ত মোহ ও রাজকীয় পদলীলা অবহেলায় প্রত্যাখ্যান করেন। জীবনের আসল সার্থকতা তো কেবল জ্ঞান সাধনায়—এই উপলব্ধি থেকেই তিনি একসময় দিল্লির পথে রওনা হন, যাঁর আগমনকাল হিসেবে ১২৬০ খ্রিষ্টাব্দের কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়।
​দিল্লির মসনদ থেকে সোনারগাঁর শান্ত স্নিগ্ধ প্রান্তর
​দিল্লিতে পৌঁছে তিনি বহুভাষিক ও বহুসংস্কৃতির এই জনপদে তাওহীদের স্নিগ্ধ বার্তা ছড়িয়ে দিতে এবং শিক্ষার্থীদের তরবীয়তের জন্য একটি অনন্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে সর্বতোভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
​কিন্তু সময়ের স্রোতে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী আমীর ও দুনিয়াপূজারী মহলের ষড়যন্ত্রের শিকার হন এই মহান সাধক। সুলতানের মনে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় দূরদর্শী শায়খ তাওয়ামা কোনো রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে নীরবে রাতের অন্ধকারে দিল্লি ত্যাগ করেন। পূর্বমুখী যাত্রায় বিহারের মনহী হয়ে অবশেষে তিনি আশ্রয় নেন বাংলার রূপসী জনপদ—সোনারগাঁর পঙ্খিরাজ খালের কূলঘেঁষা স্নিগ্ধ প্রকৃতিতে।
​সোনারগাঁয়ে জ্ঞানালোক ও আধ্যাত্মিক বিপ্লব
​১২৭০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সোনারগাঁয়ে পা রেখে তিনি শুধু একটি আবাসিক শিক্ষালয় বা মাদ্রাসাই গড়েননি, বরং তা রূপ নিয়েছিল তৎকালীন সময়ের সর্বোচ্চ মানের এক বিদ্যাপীঠে, যা আজকের দিনের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদানের মানকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল একটি সুবিন্যস্ত খানকাহ ও লঙ্গরখানা, যেখানে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত মানুষের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা থাকত নিত্যদিন।
​কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় আটকে থাকেননি এই কূটনৈমিতিক ও প্রাজ্ঞ মনীষী। বাংলার নানা প্রান্ত থেকে যখনই কোনো অন্যায়, নিপীড়ন কিংবা দূরদূরান্ত থেকে মানুষের কষ্টের সংবাদ আসত, তিনি তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতা দিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা করতেন। সোনারগাঁকে কেন্দ্র করে বাংলা ও আসামের জনপদে শান্তি ও ন্যায়ের সুবাতাস বইয়ে দেওয়ায় তাঁর অবদান ছিল অতুলনীয়।
​এক চিরন্তন ইন্তিকাল ও রেখে যাওয়া ঐতিহ্য
​বাংলার এই মহান চিন্তানায়ক ও সাধক মনীষী ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দে সোনারগাঁর মাটিতেই ইন্তিকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রিয় ছাত্র হযরত শিহাবুদ্দীন ইয়াহইয়া মনরীর ওপর অর্পিত হয় এই সুমহান জ্ঞানপীঠ পরিচালনার দায়িত্ব। শায়খ তাওয়ামার হাতে রোপিত সেই জ্ঞানবৃক্ষ কেবল সোনারগাঁয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সময়ের হাত ধরে তা ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার দিগ্বিদিক প্রান্তে।
​আজকের এই কোলাহলপূর্ণ যুগে সোনারগাঁর সবুজ প্রকৃতি আর প্রাচীন জনপদের অবয়বে শায়খ তাওয়ামার নাম চিরভাস্বর হয়ে আছে। বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্রোতধারায় তাঁর অবদান আমাদের অন্তরে আজও এক গভীর আলোড়ন তোলে।
​লিখেছেন: নিসর্গবিন্দু

​#শায়খ_আবু_তাওয়ামা #সোনারগাঁর_ইতিহাস #বাংলার_ঐতিহ্য #নিসর্গবিন্দু

Share.
Exit mobile version